Tuesday, August 18, 2026
বাড়ি রাজ্য উচ্চ আদালতে তীব্র ভৎসনার মুখে পড়তে হল রাজ্য পুলিশকে

উচ্চ আদালতে তীব্র ভৎসনার মুখে পড়তে হল রাজ্য পুলিশকে

উচ্চ আদালতে তীব্র ভৎসনার মুখে পড়তে হল রাজ্য পুলিশকে

স্যন্দন ডিজিটাল ডেস্ক, আগরতলা। ১৪ মে : বেআইনিভাবে আটক করা এবং গ্রেপ্তারের দায়ে উচ্চ আদালতে বড়সড় ধাক্কা খেল রাজ্য পুলিশ। ঘটনার বিবরণে জানা যায় বনমালীপুরের বাসিন্দা রত্না রায়ের বাড়িতে নির্মীয়মাণ কাজ চালু রাখার জন্য পুর নিগমের টাস্ক ফোর্সের কর্মী রবীন্দ্রনাথ ঘোষ ২ লক্ষ টাকা দাবি করেছিলেন। দাবি মোতাবেক টাকা না দেওয়ায় ৪ এপ্রিল রবীন্দ্রনাথ ঘোষ ও জয়দেব ঘোষের নেতৃত্বে একদল দুষ্কৃতি রত্না রায়ের বাড়িতে চড়াও হয়। রত্না রায়ের ছেলে সৈকত সাহাকে বেধড়ক ভাবে মারধর করা হয়। তাকে বাঁচাতে তার মা-বাবা এগিয়ে আসলে তাদেরকেও মারধর করা হয়। তারপর দুষ্কৃতিরা সৈকত সাহাকে পূর্ব আগরতলা থানায় তুলে নিয়ে যায়।

সেখানে তার উপর যৌন নিগ্রহ করে রবীন্দ্রনাথ ঘোষ। ৬ এপ্রিল পূর্ব আগরতলা মহিলা থানায় রত্না রায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। পুর নিগমের কমিশনারের নিকটও লিখিত অভিযোগ জানান। তারপরও এফ আই আর নথিভূক্ত করেনি পূর্ব আগরতলা থানার পুলিশ। পশ্চিম ত্রিপুরার জেলা পুলিশ সুপার ও রাজ্য পুলিশের মহা নির্দেশককে লিখিত এই বিষয়ে জানানোর পরও এফআইআর নথিভুক্ত করা হয় নি। তাই উচ্চ আদালতে রিট মামলা দাখিল করেন রত্না রায়। ৬ মে উচ্চ আদালত নোটিশ জারি করে। নোটিশ পেয়ে তরিঘরি ৭ মে পূর্ব আগরতলা থানা এফ আইআর নথিভুক্ত করে। কিন্তু থানার অভ্যন্তরে যৌন  নির্যাতন, সরকারি কর্মচারীর ঘুষ চাওয়া ইত্যাদি অভিযোগের ভিত্তিতে বিএনএস-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় এফ আই আর নথিভুক্ত করা হয়নি। উচ্চ আদালতে রাজ্য সরকারের হলফনামায় বলা হয়, প্রাথমিক তদন্তের পরেই এফ আই আর নথিভুক্ত করা হয়েছে। হলফনামায় উল্লেখ করা হয় রত্না রায়ের ছেলে সৈকত সাহার বিরুদ্ধে ৬ এপ্রিল এফ আই আর নথিভুক্ত হয়েছে সরকারি কর্মচারীকে কাজে বাধাদান ও মদমত্ত অবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে। সৈকতকে গ্রেফতার করা হয়েছে রাত্রি সাড়ে এগারোটা নাগাদ।

পরবর্তী সময় পরের দিন তাকে থানা থেকে জামিন দেওয়া হয়েছে। আবেদনকারীর পক্ষে বরিষ্ঠ আইনজীবী পুরুষোত্তম রায় বর্মন দাবি করেন সৈকতের গ্রেফতার সম্পূর্ণ বেআইনি। প্রাথমিক তদন্তের কোন প্রয়োজন ছিল না। যেহেতু লিখিত অভিযোগে ধর্তব্যযোগ্য গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। রাজ্য সরকারের পক্ষে পাবলিক প্রসিকিউটর বুধবার আদালতে জানান যে পূর্ব থানার ওসির বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়েছে। এবং এফ আই আর গ্রহণে পশ্চিম জেলা পুলিশ সুপারের নির্দেশিকা অমান্য করার বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য ইতিমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঘোষের বিরুদ্ধে এফআইআর-এ ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ ও অপহরণের অভিযোগ সংক্রান্ত ধারা ইতিমধ্যে সিজেএম পশ্চিম ত্রিপুরা জেলার অনুমতি ক্রমে যুক্ত করা হয়েছে। যদিও প্রধান বিচারপতি এম এস রামচন্দ্র রাও বিচারপতি বিশ্বজিৎ পালিতের ডিভিশন বেঞ্চ এই বক্তব্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। বুধবার উচ্চ আদালত পুলিশ ইন্সপেক্টর সুকান্ত দে-র বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে আদালত অবমাননার মামলা গ্রহণ করে নোটিশ জারি করে। শুধু তাই নয় আগরতলা পুরপরিষদের কমিশনারকে মামলায় পক্ষভুক্ত করে নোটিশ জারি করা হয়েছে।

রিট মামলা ও আদালত অবমাননার মামলাটি বৃহস্পতিবারের তালিকাভুক্ত করার নির্দেশ দেন। বৃহস্পতিবার রিট মামলায় উচ্চ আদালতের ডিভিশন বেঞ্চ নির্দেশ দিয়ে বলে আবেদনকারীর এফ আই আর গ্রহণ করার পূর্বে প্রাথমিক তদন্তের কোন প্রয়োজন ছিলনা এবং প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট উচ্চ আদালত নাকচ করে দিয়েছে। কারণ তথাকথিত প্রাথমিক পুর কর্মচারীর ঘুষ দাবি করা এবং পূর্ব থানার অভ্যন্তরে অভিযোগকারীর পুত্রের উপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগের কোন তদন্তই করা হয়নি। রাজ্য পুলিশকে উচ্চ আদালত তীব্র ভাবে ভৎসনা করে। উচ্চ আদালত পূর্ব থানার তদন্তের উপর সম্পূর্ণ ভাবে অনাস্থা প্রকাশ করে। অভিযোগকারীর এফআইআর-এর ভিত্তিতে গৃহীত মামলায় ও পুর কর্মচারীর এফ আই আর-এর ভিত্তিতে গৃহীত মামলার তদন্ত করার জন্য উচ্চ আদালত একটি বিশেষ তদন্তকারী টিম বা সিট গঠন করেছে। সিটের প্রধান হিসেবে পশ্চিম ত্রিপুরা জেলার বাইরে কর্মরত একজন ডি এস পি পদমর্যাদার অফিসারকে নিযুক্ত করার জন্য রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে। উচ্চ আদালতে এও নির্দেশ দিয়েছে এই সিটের সাথে পশ্চিম ত্রিপুরায় কর্মরত কোনো পুলিশ আধিকারিক যুক্ত থাকতে পারবে না। এবং এসআইটি-র তদারকি করার জন্য ডিআইজি পদমর্যাদার অফিসারকে নিযুক্ত করার জন্য রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত। একইভাবে সাথে উচ্চ আদালত নির্দেশ দিয়েছে সৈকত সাহার গ্রেপ্তার বেআইনি ও অবৈধ এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য করে গ্রেফতার করায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসার উচ্চ আদালত অবমাননা করেছেন। পুর নিগমের পক্ষ থেকে এইদিন উচ্চ আদালতে জানানো হয় সংশ্লিষ্ট পুলিশ আধিকারিকের বিরুদ্ধে তদন্ত করে অভিযোগের যথার্থতা পাওয়া যায় নি। উচ্চ আদালত সংশ্লিষ্ট পুর কর্মচারীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্বেও তার বিরুদ্ধে এখনো পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় বিষ্ময় প্রকাশ করে। উচ্চ আদালত সিটকে স্ট্যাটাস রিপোর্ট দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছে। আদালত অবমাননায় অভিযুক্ত পুলিশ ইন্সপেক্টরকে এই মামলার পরবর্তী শুনানির পূর্বে আদালতে হলফনামা জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উচ্চ আদালতের এই অন্তর্বর্তীকালিন নির্দেশের বিষয়ে জানান অভিযোগকারিনির পক্ষের আইনজীবী। উচ্চ আদালতের এইদিনের নির্দেশে রাজ্য পুলিশের আইনবিরোধী ভূমিকা গুরুতরভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো। অপরাধীদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠ তদন্তের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে অপরাধীদের রক্ষাকর্তা হিসাবে ভূমিকা পালন করেছে পুলিশ।

Abhishek Dey
সাংবাদিক (Journalist)

মন্তব্য সমূহ (0)

  • এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

আপনার মতামত জানান

Captcha