আগরতলা,
২৪ অক্টোবর
(হি.স.)
: এসআইআর
(স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন)
প্রক্রিয়া বাতিল,
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ সহ চার দফা দাবিতে আগামী ৩০ অক্টোবর আগরতলায় আন্দোলনে নামছে ইন্ডি জোটের ত্রিপুরা বিভাগ। ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা,
নাগরিকদের ভোটাধিকার রক্ষা এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দাবিতে এই কর্মসূচি গ্রহণ করেছে বিরোধী দলগুলির জোট। ওইদিন সকাল ১১টায় রাজধানীর ওরিয়েন্ট চৌমুহনীতে জমায়েত হবেন জোটের নেতৃত্ব,
কর্মী ও সমর্থকেরা। সেখান থেকে মিছিল করে ত্রিপুরার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের
(সিইও)
দফতরের দিকে এগিয়ে যাবেন তাঁরা। পরে সেখানে চার দফা দাবিসনদ পেশ করা হবে। শনিবার আগরতলা প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে এই কর্মসূচির ঘোষণা করেন সিপিআই(এম)-এর রাজ্য সম্পাদক জিতেন্দ্র চৌধুরী। সাংবাদিক সম্মেলনে কংগ্রেস,
সিপিআই(এম),
সিপিআই(এমএল),
আরএসপি এবং ফরওয়ার্ড ব্লকের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
সাংবাদিক সম্মেলনে জিতেন্দ্র চৌধুরী অভিযোগ করেন,
বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং সাংবিধানিক কাঠামোকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। তাঁর বক্তব্য,
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। সেই নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে বিরোধীদের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে,
তা দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত বলেও দাবি করেন তিনি।
এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সিপিআই(এম)
রাজ্য সম্পাদক বলেন,
এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক বৈধ ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর দাবি,
ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে কোনওভাবেই প্রকৃত ভোটারদের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করা চলবে না। ত্রিপুরায় প্রায় আড়াই লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়তে পারে বলে বিভিন্ন মহলে যে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে,
সেই প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। যদিও সম্ভাব্য এই সংখ্যার বিষয়ে চূড়ান্ত সরকারি তথ্য বা যাচাই করা পরিসংখ্যান সাংবাদিক সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়নি।
জিতেন্দ্র চৌধুরীর বক্তব্য,
ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হওয়া জরুরি। প্রকৃত ভোটারদের নাম যাতে কোনওভাবেই বাদ না যায়,
তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। একই সঙ্গে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে কমিশনকে সমস্ত রাজনৈতিক দলের প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করতে হবে। তাঁর মতে,
গণতন্ত্র ও সংবিধানের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে বিরোধী দলগুলির ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই জোটের চার দফা দাবির মধ্যে রয়েছে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ,
এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিল,
নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও গণতান্ত্রিক কাঠামো রক্ষার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট আইন পুনর্বিবেচনা ও বাতিলের দাবি এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া সংক্রান্ত বিধানের বিরোধিতা। এই দাবিগুলিকে সামনে রেখেই আগামী ৩০ অক্টোবরের কর্মসূচি পালন করা হবে বলে জানান বিরোধী নেতৃত্ব। তাঁদের বক্তব্য,
নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা না গেলে গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
অন্যদিকে,
সাংবাদিক সম্মেলনে ত্রিপুরা প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সভাপতি আশিস কুমার সাহাও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলেন। তিনি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের ভূমিকার সমালোচনা করে অভিযোগ করেন,
নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। তাঁর দাবি,
অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারকে উপেক্ষা করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হচ্ছে,
যা কমিশনের অভ্যন্তরীণ কার্যপ্রণালী ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ তৈরি করছে। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখতে কমিশনের কাজকর্মে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বৈধ ভোটারদের ভোটাধিকার সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে আশিস কুমার সাহা বলেন,
ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ পড়লে তা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে উদ্বেগজনক হবে। ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির পদ্ধতিতে পরিবর্তন,
একই ব্যক্তির নাম একাধিক জায়গায় নথিভুক্ত থাকা এবং নির্দিষ্ট ঠিকানায় অস্বাভাবিক সংখ্যক ভোটারের নাম থাকার মতো বিষয়গুলিও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর বক্তব্য,
ভোটার তালিকায় প্রকৃত অনিয়ম থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে চিহ্নিত করে সংশোধন করা প্রয়োজন। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় কোনও বৈধ ভোটার যেন বঞ্চিত না হন,
তা নিশ্চিত করতে হবে।
এই প্রসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার একটি এলাকায় একই ঠিকানায় ১৩ হাজারেরও বেশি ভোটারের নাম নথিভুক্ত থাকার অভিযোগও তোলেন কংগ্রেস সভাপতি। তাঁর বক্তব্য,
এ ধরনের অভিযোগ ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে। তবে এই অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। ভোটার তালিকায় কোনও অনিয়ম থাকলে তার যথাযথ তদন্ত এবং স্বচ্ছ পদ্ধতিতে সংশোধনের দাবি জানান তিনি।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী বিভিন্ন তথ্য ও নথি প্রকাশ্যে এনেছেন বলেও উল্লেখ করেন আশিস কুমার সাহা। তাঁর দাবি,
নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং ভোটার তালিকা সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্ন সামনে আনতে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ এবং বৈধ ভোটারদের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে,
নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখতে প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ পর্যালোচনা হওয়া উচিত।
আশিস কুমার সাহা স্পষ্ট করে জানান,
প্রস্তাবিত আন্দোলন কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের স্বার্থে নয়। তাঁর দাবি,
এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য নাগরিকদের ভোটাধিকার রক্ষা,
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে শক্তিশালী করা এবং সংবিধানের মর্যাদা বজায় রাখা। তাই ইন্ডি জোটের অন্তর্ভুক্ত দলগুলির পাশাপাশি জোটের বাইরে থাকা অন্যান্য রাজনৈতিক দল এবং গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষকেও এই আন্দোলনে শামিল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য,
ভোটাধিকার রক্ষার প্রশ্নে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলা প্রয়োজন।
ত্রিপুরার রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও শাসক দলকে নিশানা করেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি। তাঁর অভিযোগ,
অর্থবল ও বাহুবলের প্রভাব খাটিয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে। যদিও এই অভিযোগের সমর্থনে সাংবাদিক সম্মেলনে নির্দিষ্ট কোনও ঘটনার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়নি। আশিস কুমার সাহার বক্তব্য,
গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার স্বার্থে বিরোধী দলগুলিকে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। নির্বাচনকে অবাধ,
সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
রাজনৈতিক মহলের মতে,
এসআইআর প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে দেশজুড়ে চলা বিতর্কের প্রেক্ষাপটে ত্রিপুরায় ইন্ডি জোটের এই কর্মসূচি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। আগামী ৩০ অক্টোবরের মিছিল ও দাবিসনদ পেশের মধ্য দিয়ে বিরোধী দলগুলি তাদের অবস্থান আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে চাইছে। বিশেষ করে ভোটার তালিকায় বৈধ ভোটারদের নাম থাকা এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রশ্নকে সামনে রেখে জনমত গড়ে তোলাই তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
মন্তব্য সমূহ (0)
আপনার মতামত জানান