Saturday, November 7, 2026
বাড়ি বিশ্ব সংবাদ ব্যাংকিং কেলেঙ্কারিতে প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনা বরখাস্ত, নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করলেন পেড্রো এলিয়ানা

ব্যাংকিং কেলেঙ্কারিতে প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনা বরখাস্ত, নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করলেন পেড্রো এলিয়ানা

ব্যাংকিং কেলেঙ্কারিতে প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনা বরখাস্ত, নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করলেন পেড্রো এলিয়ানা



আসুন্সিয়ন, ৭ নভেম্বর (হি.স.) :দক্ষিণ আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়েতে এক নজিরবিহীন ব্যাংকিং কেলেঙ্কারির জেরে চরম রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। দেশের অন্যতম প্রধান আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘উয়েনো ব্যাংক’-এর আর্থিক সংকট এবং এর সঙ্গে যুক্ত নানা অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় দেশটির প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনাকে মহিমভঙ্গের (ইমপিচমেন্ট) মাধ্যমে পদচ্যুত করা হয়েছে। তাঁর পতনের পরই শুক্রবার দেশটির ৫৩তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেছেন উপরাষ্ট্রপতি পেড্রো এলিয়ানা। এই আকস্মিক ও নাটকীয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে সমগ্র প্যারাগুয়ের রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘আল জাজিরা’ সূত্রে প্রাপ্ত খবরে জানা গিয়েছে, শুক্রবার প্যারাগুয়ের ৪৫ সদস্যের উচ্চকক্ষ সেনেটে প্রেসিডেন্ট পেনার বিরুদ্ধে মহিমভঙ্গ প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটি হয়। এই ভোটাভুটিতে রেকর্ড সংখ্যক অর্থাৎ ৪৪ জন সেনেটারই অভিশংসনের পক্ষে রায় দেন, এবং মাত্র একজন সদস্য ভোটদান থেকে বিরত থাকেন। এর আগে নিম্নকক্ষ ‘চেম্বার অফ ডেপুটিজ’-এও ৭৪-০ ভোটে এই মহিমভঙ্গ প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে সমর্থিত হয়েছিল।

ক্ষমতা হারানোর পর সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় সান্তিয়াগো পেনা জানিয়েছেন যে, তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেই বিদায় নিচ্ছেন এবং যাঁরা এখনও এই কেলেঙ্কারির সঠিক বিচার ও উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছেন, তাঁদের দুঃখ-বেদনা তিনি সম্পূর্ণ উপলব্ধি করতে পারছেন।

প্যারাগুয়ের এই গভীর রাজনৈতিক সংকটের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘উয়েনো ব্যাংক’-এর বড় ধরনের আর্থিক ধস। গত মঙ্গলবার দেশটির সেন্ট্রাল ব্যাংক অফ প্যারাগুয়ে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায় যে, উয়েনো ব্যাংক তাদের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও তারল্য বজায় রাখার আইনি মানদণ্ডগুলি পূরণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলেই ব্যাংকের লক্ষ লক্ষ গ্রাহকের গচ্ছিত আমানত, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং অবসরকালীন পেনশন প্রদান নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। উল্লেখ্য, প্রায় ৩০ লক্ষ গ্রাহক বিশিষ্ট এই ব্যাংকটি প্যারাগুয়ের মোট প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষকে আর্থিক পরিষেবা প্রদান করে আসত। এমনকি জমা টাকার নিরিখে এটি দেশটির পঞ্চম বৃহত্তম ব্যাংকে পরিণত হয়েছিল।

এই ব্যাংকিং কেলেঙ্কারিতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনার সরাসরি ভূমিকা ও সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ২০২৩ সালে পেনাকে উয়েনো ব্যাংকের মূল কোম্পানির অন্যতম শেয়ারহোল্ডার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। যদিও পেনার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে, তিনি ২০২৫ সালের শুরুর দিকেই তাঁর সমস্ত শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছিলেন।

বর্তমানে দেশের তদন্তকারী ও দুর্নীতি দমন সংস্থাগুলো এই বিষয়টির গভীরে গিয়ে তদন্ত করছে যে, সরকারি যোগাযোগ এবং উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়েই ব্যাংকটিকে এতদিন নিয়ামক সংস্থার কঠোর আইনি পদক্ষেপ থেকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল কি না। জানা গিয়েছে, সরকারি পেনশন তহবিলের প্রায় ৩৫ কোটি ৫০ লক্ষ মার্কিন ডলারের বিশাল অংকের অর্থও ওই ব্যাংকে বিনিয়োগ করা হয়েছিল। এই ঘটনায় প্যারাগুয়ের সেন্ট্রাল ব্যাংকের প্রাক্তন প্রধান কার্লোস কার্ভালোর বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। ব্যাংকের ওপর নজরদারির ক্ষেত্রে গুরুতর গাফিলতি ও ব্যর্থতার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। উল্লেখ্য, এই কেলেঙ্কারি সামনে আসার পরেই চলতি সপ্তাহে তিনি নিজের পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। এখনও পর্যন্ত এই আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় অন্তত ২৭ জনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি বা অপরাধমূলক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। অভিযুক্তদের তালিকায় ব্যাংকের প্রধান শেয়ারহোল্ডার মিগুয়েল ভাজকেজ-এর নামও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ধৃত ও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে জালিয়াতি, বিশ্বাসের অবমাননা, তছরুপ এবং প্রভাবের অপব্যবহারের মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।

এমতাবস্থায়, যখন প্যারাগুয়ে এক অত্যন্ত গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে, ঠিক সেই সংকটজনক মুহূর্তে দেশের সর্বোচ্চ পদে আসীন হলেন নতুন প্রেসিডেন্ট পেড্রো এলিয়ানা। এখন তাঁর প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—দেশের ভেঙে পড়া ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের হারিয়ে যাওয়া আস্থা পুনরুদ্ধার করা, ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষিত করা এবং এই গোটা কেলেঙ্কারির একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করা। অন্যদিকে, প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনা জানিয়েছেন যে, তিনি এই তদন্ত প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সহযোগিতা করবেন। তিনি আরও বলেন, তাঁর উপস্থিতি যদি দেশে আরও বেশি রাজনৈতিক অস্থিরতা বা বিভাজনের সৃষ্টি করে, তবে তিনি তা এড়িয়ে চলতেই বেশি পছন্দ করবেন।

Abhishek Dey
সাংবাদিক (Journalist)

মন্তব্য সমূহ (0)

  • এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

আপনার মতামত জানান

Captcha